@ সুমন সেনগুপ্ত
আধারের সঙ্গে মহিলাদের বিশেষ কোনও সম্পর্ক আছে কি? আছে বইকি!
ব্যাঙ্ক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন বা কারবার করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মহিলারা ভয়ঙ্কর রকম পিছিয়ে আছেন। যাকে বলা হয় অর্থিক সাক্ষরতা, অর্থাৎ আর্থিক বিষয়গুলো তিনি কতটা বোঝেন এবং নিরপেক্ষভাবে কতটা সামলাতে পারেন। একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে আমাদের দেশে মহিলাদের মধ্যে আর্থিক নিরক্ষর ৮৪ শতাংশ। অথচ হঠাৎ গরিব এবং মধ্যবিত্তের প্রাপ্য যাবতীয় রেশন, অনুদান বা পেনশন আধার কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ায় সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন মহিলারাই। যে দেশে প্রায় ৭০ ভাগ মহিলা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষই পায়নি, সেখানে তাঁদের রাতারাতি ডিজিটাল ব্যবস্থায় পারদর্শী হয়ে উঠরে বললে তো চলবে না। তার ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রেস্ত হচ্ছেন মহিলারাই।
বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখা যেতে পারে। ২০০৯ সালে যখন আধার চালু হয়, তখন সেই মঞ্চে ৩ জন মহিলা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের একজন সোনিয়া গান্ধী আর অন্য দুজন মহিলা যাঁদের হাতে সেদিন আধার কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছিল। তাহলে আজ প্রায় ১০ বছর পরে কেন অভিযোগ উঠছে যে, আধারের কারণে মহিলারা বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন? তথ্য বলছে, আধারের কারণে নানা রকম সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে মূলত যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের সিংহভাগ গ্রামের নিরক্ষর মহিলা, যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহার কররে পারেন না, যাঁদের হাতে আধুনিক স্মার্ট ফোন নেই বা এই সব ব্যবস্থায় অভ্যস্ত নন। সরকারি তথ্য বলছে, ৬৮% মহিলা আজও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকে গেছেন। কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তার ২৯% মহিলা। অথচ UIDAI বা আধার কতৃপক্ষ বলছে, ‘Transfer and payment of Old Age, Widow & Disability Pensions made easier with Aadhaar Enabled Payment Systems ( AEPS)’ তাহলে কোনটা আপনি বিশ্বাস করবেন? যে মানুষ খেতে না পেয়ে মারা যাচ্ছে সেটা, না UIDAI বা আধার কতৃপক্ষ যেটা বলছে সেটা? যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহার করেন তাঁদের মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং করেন। UIDAI বা আধার কতৃপক্ষ সম্পর্কে যদি কোনও অভিযোগ থাকে— তা সে নামের ভুল বা ঠিকানার ভুল যাই হোক, তা সংশেধন করতে হলে আপনাকে UIDAI-এর ওয়েবসাইটে ঢুকে তা করতে হবে। কোনও বয়স্ক মহিলার যদি হাতের ছাপ বা চোখের মণি মিলিয়ে সত্যতা যাচাই (AUTHENTICATION) করার সময় যদি কোথাও অসুবিধা হয় তাহলে তিনি কীভাবে তাঁর প্রাপ্য পেনশন বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা আদায় করতে পারবেন?এর সহজ উত্তর হচ্ছে পারবেন না, কারণ আধারের মাপকাঠিতে তাঁর কোনও অস্তিত্ব নেই। তিনি মৃত। তাহলে তিনি কিভাবে তাঁর অভিযোগ জানাবেন? বাস্তব অবস্থা বলছে, অভিযোগ জানাতে পারবেন না।
দেখা গেছে মাত্র ১৬ শতাংশ মহিলা ব্যাঙ্কে টাকা জমা দেওয়ার মতো সাধারণ কাজগুলো করতে পারেন, বেশ কিছু উদাহরণ দিলে আমার এই কথার স্বপক্ষে কিছু যুক্তি তৈরি হবে।
১। ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা ‘আশা দেবী গজু’ আধার কার্ডে নাম রয়েছে ‘আশা দেবী গ্নজু’। আধার কর্তৃপক্ষের এই ভুলের জন্য ২০১৬ সাল থেকে তিনি পেনশন পাচ্ছেন না। ব্যাঙ্কের দরজায় ঘুরে ঘুরেও কোনও সুরাহা হয়নি।
২। গাংগী টুটিও ঝাড়খণ্ডের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর আধার কার্ড নেই। কারণ তাঁর গ্রামের সবাই যখন আধার কার্ড বানাচ্ছিলেন তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। ফলে তার রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার সংযুক্তি হয়নি। তাই ২০১৭ সাল থেকে তাঁর রেশন বন্ধ।
৩। হরিয়ানার গ্রামটির নাম ‘ইন্দিরা চক্রবর্তী’। সেটি মূলত কুষ্ঠ রোগীদের জন্য গড়ে তোলা গ্রাম। সেখানে অধিকাংশ কুষ্ঠ রোগীর আঙ্গুল নেই। তাই তাঁদের আধার হয়নি। ফলে রেশন কার্জের সঙ্গে আধার সংযুক্তিকরণ হয়নি। তাই তাঁদের রেশন, পেনশন সব কিছুই মেলে না।
৪। বালুরঘাটের মামনি সম্পূর্ণ বিকলাঙ্গ এক মহিলা। বেঁচে আছেন ৬০০ টাকা প্রতিবন্ধী ভাতার উপর। আধার করতে গিয়ে দেখা গেল তাঁর চোখের আইরিস মেলানো যাচ্ছে না। তাই তাঁকে আধার দেওয়া হয়নি। ফলে ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে ব্যঙ্ক।
৫। ঝাড়খণ্ডের সন্তোষীর নামটার সঙ্গে এতদিনে হয়ত অনেকেই পরিচিত। রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার সংযুক্ত ছিল না বলে রেশন পায়নি। স্রেফ অনাহারে মারা যায় সন্তোষী। প্রথমে সরকার মানতে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয় যে আধার সংযুক্তিকরণ না করার ফলেই এই মৃত্যু।
৬। উত্তরপ্রদেশে ১১ বছরের একটি মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য আধার কার্ড করানো হয়েছে ১৮ বছর বয়স দেখিয়ে। পরে তা জানাজানি হয়। ওদিকে সরকার বলছে ‘বাল্য বিবাহ’ রুখতে আধারের প্রয়োজন।
৭। কেরালায় পারাভুর গ্রামে এক মহিলা ধর্ষিতা হন। তারপর তাঁকে কেউ বিয়ে করে। তাঁর নতুন আধার কার্ড বানানো হয় বিবাহিত পদবী দেখিয়ে। তারপর তাকে ‘যৌনদাসী’ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। জানাজানি হওয়ার পরে থানা-পুলিশ হয়। এর বিরুদ্ধে কেরালা হাইকোর্টে পিটিশন জমা পড়েছে।
৮। শকুন্তলা দেবী কার্গিল শহিদের স্ত্রী। কিন্তু আধার তো তা জানে না। আধার শুধু বোঝে নম্বর। তাই হাসপাতালে শকুন্তলা দেবীর চিকিৎসা করানো যায়নি। তিনি মারা যান।
৯। চন্ডীগডের এক দম্পতি তাঁদের সন্তান ২ বছরের প্রণব সাইনিকে স্কুলে ভর্তি করাতে যান। সেখানে তাঁদের বলা হয়, ওই বাচ্চার আধার নম্বর লাগবে। তাঁরা তো আমার আপনার মতই কিছু না বুঝেই স্থানীয় একটি আধার এনরোলমেন্ট সেন্টারে যান ২০১৭ সালের ১৮ নভেম্বর। বাচ্চার বাবা মোটামুটি শিক্ষিত, তাই তাঁর মেল আইডি আছে। সেই মেল আইডিতে ১ মাস পরে একটি মেল আসে, আধার কতৃপক্ষের কাছ থেকে যে, কোনও বিশেষ কারণে তাঁর আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এরপর তাঁরা আবার একটি বেসরকারি সংস্থার কাছে যান। সেখানে আবারও আধারের আবেদন করেন। ১৫ দিন পরে আধারের ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখেন, তখনও কিছু হয়নি। যেহেতু বাচ্চাটি ছোট, তাই প্রতিবারই বাচ্চাটির মাকে তার হাতের ছাপ এবং চোখ ও মুখের ছবি দিতে হয়। সম্প্রতি বাচ্চাটির বাবা-মার কাছে, দুটি খাম আসে। দেখেন বাচ্চার দুটো আধার কার্ড এসেছে। শুধু নম্বর দুটো আলাদা, আর সমস্ত কিছু হুবহু একই রকম। এবার তাঁরা বুঝতে পারছেন না কোনটা আসল আর কোনটা নকল। ফেরত দিতেও পারছেন না।
এরকম সারা দেশের অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট সংবাদপত্রে বা টিভিতে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। আপাতত শেষ উদাহরণটা দিয়ে এই লেখার উপসংহারে আসবো।
অন্ধ্রপ্রদেশের দুজন মহিলা— একজন টোটা লক্ষ্মী, অন্যজন পাথোবা লক্ষ্মী। দুজনেই ১০০ দিনের কাজ করেছেন। একজন ৯৫ দিন অন্যজন ৮৩ দিন। একজনের প্রাপ্য ১৬০০০ টাকা, অন্যজনের ৯০০০ টাকা। যাঁরা টাকাটা স্টেট ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছেন তাঁদের কোনও ভুলের কারণে একজনের টাকা অন্যজনের অ্যাকাউন্টে চলে গেছে। এবার এই দুই দলিত মহিলার হয়রানির পালা। রোজ তাঁরা দেড় কিলোমিটার হাঁটছেন শুধু এই কথাটা শুনতে ‘কাল আবার আসুন, দেখছি’।
কিন্তু দুজনের কেউই টাকা তুলতে পারছে না, কারণ অ্যাকাউন্টগুলোর সঙ্গে আধার যুক্ত করা হয়েছে আগেই। ফলে ম্যানেজারও টাকা দিতে পারছেন না। ওই গ্রামে মোট ১০০০০ মানুষের বাস। তার মধ্যে ৭০০ জন NREGA প্রকল্পে কাজ করেন। ২০১৫-এর এপ্রিল থেকে ওই গ্রামের মানুষদের ১০ লক্ষ টাকা বাকি পড়ে আছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর বলছে, তারা সঠিক মানুষ চেনার জন্য আধার সংযুক্তিকরণ করাচ্ছে। আসলে এই সংযুক্তিকরণের মধ্যে দিয়ে কিছু মানুষকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তাই অর্থমন্ত্রী লোকসভায় বুক বাজিয়ে বলছেন, আধারের মাধ্যমে আমরা ৫৫০০ কোটি টাকা সঞ্চয় করেছি। আধার একটা নম্বর। তা প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি। সুতরাং প্রযুক্তি কাজ না করলে করলে আপনি আধারের চোখে ‘বাদ’ পড়ে যাবেন। মৃত বলে ঘোষিত হবেন। আর আপনার প্রাপ্য সরকারি সুবিধাটা সরকারি ‘সঞ্চয়’ হিসেবে দেখানো হবে। এই সমস্যা থেকে বেরোনোর কোনও উপায় নেই, যদি না আধার ব্যবস্তাটা ধ্বংস করা যায়।
লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুকার এবং বিশিষ্ট সমাজকৰ্মী
0 comments: