Showing posts with label Naya Thahar. Show all posts
Showing posts with label Naya Thahar. Show all posts
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন, এই দিবসে বাঙালীরা বিপন্নবােধ করছে

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন, এই দিবসে বাঙালীরা বিপন্নবােধ করছে

‘
আমি ১৯-এ দেখি ২১, ২১-এ দেখি ১৯, জানাই হাজার কুর্নিশ, মিলে মিশে এপার ওপার, দিন দিন একাকার 
অমল গুপ্ত,  গুয়াহাটি : 
১৯৫২ সালের আজকে ২১ ফেব্রুয়ারী, বাংলাভাষা রক্ষার তাগিদে ঢাকার রাজপথে প্রাণ আহুতি দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, বরকতরা৷ তার আগে ১৯৬১ সালের ১৯ মে’বরাক উপত্যকার শিলচর শহরে একজন যুবতীসহ ১১জন যুবক পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন সেই একই মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। বাংলাভাষা রক্ষা। 
তাই আজ ২১-এ ফেব্রুয়ারী, বাংলাদেশ-অসমেৰ ভাষা শহীদদের স্মরণে লামডিং এর বিশিষ্ট কবি প্রদীপ সেন গুপ্ত ফেসবুকে পােষ্ট করে লিখেছেন—‘আমি ১৯-এ দেখি ২১, ২১-এ দেখি ১৯, জানাই হাজার কুর্নিশ, মিলে মিশে এপার ওপার, দিন দিন একাকার। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন আজ বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি লাভ করেছে। রাষ্ট্রসংঘের ইউনেস্কো ২১ এ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘােষণা করেছে, এই দিনটি সাড়া বিশ্বের মাতৃভাষা প্ৰেমী মানুষ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে উদযাপন করে থাকে। আজ বাংলাদেশের ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে শহীদ স্মারক কেন্দ্র ‘সাবার’ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে মর্যাদা ও গাম্ভীৰ্যতার সঙ্গে দিনটি পালন করা হয়। ১৯৫২সালে ২১-এ ফেব্রুয়ারী সালাম, রফিক, বরকতরা মায়ের ভাষা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছিলেন, কিন্তু বড় দুঃখ ও পরিতাপের কথা দেশ ভাগেরবলি, ঐতিহাসিক বিভিন্ন কারণে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বা অন্য কারণে এ রাজ্যে আসা লক্ষ লক্ষ ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগােষ্ঠীর মানুষ এক টুকরাে জমির হাতছানি, রাজনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে মায়ের ভাষা বাংলাভাষা ত্যাগ করে অসমীয়া ভাষা গ্রহণ করেছিল। 
পরিবেশ পরিস্থিতি হয়তাে বাধ্য করেছিল, রাজনৈতিক অধিকার, বা ভূমির অধিকার পাওয়ার থেকেও মাতৃভাষা ত্যাগ করাটা কতটা যন্ত্রণাদায়ক তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে একাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। সাত-আট দশক পরেও রাজ্যের জাতীয়তাবাদী শিবির মাতৃভাষা ত্যাগ করা ‘অসমীয়া ভাষী’ মুসলিমদের মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। আজও তাদের ‘পামুয়া মুসলিম’, বাংলাদেশী’ প্রভৃতি অপমানকর তকমা সেঁটে দেওয়া হয়। মাতৃভাষা ত্যাগ করে অন্য ভাষা গ্রহণ করার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে সেই কথায় বলছিলেন রাজ্যের বিশিষ্ট সাংবাদিক দিগন্ত শৰ্মা। বিশ্ব কাঁপানাে নেলীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড, লাওখােয়া প্রভৃতি জায়গার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তথ্য মূলক গ্রন্থ লিখেছেন সাংবাদিক দিগন্ত শৰ্মা। সাপ্তাহিক সাদিন-এর সাংবাদিক শৰ্মা আজ মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সব মাতৃভাষার কথায় উল্লেখ করা হয়েছে। অসমীয়া, বাঙালী, বড়াে প্রভৃতি সব ভাষার কথায় বলা হয়েছে। কিন্তু ব্ৰহ্মপুত্ৰ উপত্যকায় মাতৃভাষা বলতেই একাংশ মানুষ অসমীয়া ভাষাকেই বােঝায়, বড়াে সাহিত্য সভার সভাপতি বিনেশ্বর ব্ৰহ্ম বড়ােভাষার লিপি রক্ষা করতে গিয়ে দুস্কৃতিদের হাতে নিহত হলেন, তার কথা কেও জানে না। 
বরাক উপত্যকায় একজন যুবতীসহ ১১ জন যুবক বাংলাভাষা রক্ষায় প্রাণ দিলেন, তাদের আজ পর্যন্ত সরকার স্বীকৃতিও দিলাে না। তা বড় লজ্জার কথা। শিলচর রেলওয়ে স্টেশনকে ভাষা শহীদ ষ্টেশন হিসাবে স্বীকৃতি জানানাের প্রস্তাবকেও ঝুলিয়ে রাখা হলাে। নিজেদের সন্তানকে মাতৃভাষা শেখানাে, পরিবারের মধ্যে রেখে শিশুকে মাতৃভাষার মাধ্যমে পরিচর্যা ও লালন পালন করার মধ্যে দিয়েই মাতৃভাষা রক্ষার অধিকার জন্মায়। রাজ্যের বিশিষ্ট সাহিত্যিক পদ্মশ্রী জয়শ্রী গােস্বামী মহন্ত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ভূমিষ্ট হওয়ার পর সন্তানরা আকারে ইঙ্গিতে মায়ের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করে। সেই ভাষাকেই স্বীকৃতি জানানাে উচিত। ফরাসিরা ফরাসি ভাষায়, বিট্রিশরা ইংরাজী ভাষায়, অসমীয়ারা অসমীয়া ভাষায়, বাঙালীরা বাংলাভাষায় কথা বলে, তাই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সব জনগােষ্ঠির মাতৃভাষার কথায় বলা হয়েছে। মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। এই ভাষা পরিচর্যার মাধ্যমে সন্তানরা জীৱনে উন্নতির শিখরে উঠতে পারে। ভাষা উন্নতির সােপান। 
মাতৃভাষার জন্য যারা প্রাণ আহুতি দিয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন পদ্মশ্রী জয়শ্রী গােস্বামী মহন্ত। রাজ্যে এক বৃহৎ সংখ্যক বাংলাভাষী মানুষের বাস, প্রায় ১ কোটি হিন্দু-মুসলিম মানুষ বাংলাভাষায় কথা বলেন। বরাক উপত্যকায় লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর ত্রি-ভাষার সূত্র অনুযায়ী বাংলাকে প্রধান ভাষা হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু নানা কারণে এবং বরাকব্রহ্মপুত্ৰে এক বৃহৎ সংখ্যক মানুষ বিদেশী ভাষা ইংরেজির প্রতি অত্যন্ত মােহ থাকার জন্য তাদের সন্তানদের কেরিয়ার গড়ার লক্ষ্যে ইংরাজী মাধ্যম বিদ্যালয় গুলিতে পড়াশুনার জন্য পাঠাচ্ছে।
রাজ্যের শতাধিক বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রীদের অভাবে যুঁকছে, তা ছাড়া ব্ৰহ্মপুত্ৰ উপত্যকার বেশ কিছু প্রাথমিক, মধ্যইংরাজী, বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়কে অসমীয়া মাধ্যম বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বাংলাভাষা আজ বিপন্নপ্রায়, শুধু অসমেই নয় প্রতিবেশি রাজ্য পশ্চিম বংঙ্গেও বাংলাভাষার প্রতি অনিহা কেরিয়ার গড়ার লক্ষ্যে ইংরাজী ভাষার মােহে আছন্ন। বাংলাদেশ এবং বরাক উপত্যকার শহীদরা কি বাংলাভাষা রক্ষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েও ন্যায্যতা পাবেনা? তাদের জীৱন কি বৃথায় যাবে?
‘তৃণ’ ছেড়ে ‘পদ্মে’ মুকুল : বঙ্গ রাজনীতিতে তেমন প্রভাব পড়বে না

‘তৃণ’ ছেড়ে ‘পদ্মে’ মুকুল : বঙ্গ রাজনীতিতে তেমন প্রভাব পড়বে না


দেবকিশোর চক্রবর্তী, কলকাতা : 
মুকুল রায় দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পৃথক দল গড়বেন। পশ্চিম বঙ্গের বর্তমান শাসক দলের অন্দর মহলেও চাপা। গুঞ্জন শুরু হয়েছিল, মুকুলবাবু আলাদা দল করলে কিছুটা হলেও প্রভাব পড়বে। নিজের কর্মদোষে দলনেত্রীর এক সময়ের ছায়াসঙ্গী দলের মধ্যেই ক্রমশঃ কোণঠাসা হয়ে পড়ছিলেন। একের পর এক পদ থেকে তাকে সরিয়ে দিয়ে দলের অন্দরে ক্রমশ গুরুত্বহীন করে দেওয়া হচ্ছিল। এক সময় এই মুকুল রায়ের হাত ধরেই তৃণমূল কংগ্রেসে সামিল হওয়া দ্বিতীয় শ্রেণির নেতাদের একাংশ তো প্রকাশ্যেই তাঁর সমালোচনায় সরব হয়ে উঠেছিলেন। দিনের পর দিন এহেন অপমানে বিদ্ধ হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন দলের ‘একদা চাণক্য’ মুকুল রায়। তাঁর এহেন মৌনতায় রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছিল বিস্তর জল্পনা৷ তখন থেকেই এ রাজ্যের সংবাদ মাধ্যমের একাংশ মুখরোচক সংবাদ প্রকাশ করে জল্পনায় ইন্ধন দিতে থাকে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতিতে সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন ভারতীয় জনতা পার্টিতে। তৃণমূল ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে তাঁর সামিল হওয়ার পর থেকে আলোচনার অভিমুখ অনেকটাই বদলে গেছে। 
তৃণমূল নেতৃত্ব অবশ্য শুরু থেকেই মকুলের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্বহীণ। প্রমাণ করতে উপেক্ষার পথ বেছে নিয়েছে। বঙ্গের শাসক দলের প্রথম সারির নেতাদের একাংশ তো প্রকাশ্যেই তাঁর এই দলত্যাগের বিষয়টিকে স্বার্থসৰ্বস্ব ‘ধান্দাবাজী” বলে উল্লেখ করেছেন। আবার ওই নেতাদের কেউ কেউ তো এমনও বলেছেন, “ওকে নিয়ে আলোচনা করা মানে সময় নষ্ট করা’। শাসক দলের নেতারা যে যাই বলুন না কেন, মুকুল রায়ের দলত্যাগ পশ্চিম বঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে কিছুটা হলেও যে প্রভাব পড়বে সেটা প্রকাশ্যে না মানলেও আড়ালে আবডালে অনেকেই মেনে নিচ্ছেন। সন্দেহ নেই বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহর সবুজ সংকেতেই মুকুলবাবুকে আনুষ্ঠানিকভাবে সামিল করানো হয়েছে গেরুয়া শিবিরে। 
একই সঙ্গে দু তরফেই বেশ কিছু শর্তও অলিখিতভাবে রাখা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতমটি অবশ্যই যেন তেন প্রকারেন। পশ্চিম বঙ্গের রাজনীতিতে পট পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করা আর সেই লক্ষ্যে যত দ্রুত সম্ভব শাসক দলের শিবির ভেঙে গেরুয়া বাহিনির শক্তিবৃদ্ধি করা। এ রাজ্যের রাজনীতিক মহলের মতে, “তৃণের মুকুল আর পদ্মের মুকুলে বিস্তর ফারাক রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। টানা চৌত্ৰিশ বছরের বাম শাসনে একমাত্র বিরোধী মুখ ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নেত্রীর শক্তিবৃদ্ধিতে সে সময় অন্যতম সৈনিক ছিলেন তিনিই। দলনেত্রীর প্রবল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠন বিস্তার করেছিলেন ঠান্ডা মাথার এই মুকুলবাবুই। শুধু তাই না, প্রতিবেশি রাজ্যগুলোতেও দলের প্রচার প্রসার বাড়াতে নিয়ম করে ছুটে বেরিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দলের নিচু তলার কৰ্মী ও সংগঠকদের সঙ্গে তাঁর ছিল প্রত্যক্ষ সম্পর্ক। আর তার চেয়েও বড় বিষয় হল, এই নাতিদীর্ঘ চেহারার মানুষটি অন্যদলের কমী সমর্থকদের ভাঙিয়ে নিয়ে এসে দলের আয়তন বৃদ্ধি করেছেন দিনের পর দিন। অন্য দলের কর্মীদের ভাঙিয়ে আনার খেলায় তাঁর বিকল্প পশ্চিম বঙ্গের রাজনীতিতে প্ৰায় নেই। আর তার চেয়েও বড় কথা, বাংলার প্রতিটি মহকুমা থেকে ব্লক স্তরের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের নামধাম আজও তাঁর ঠোঁটস্থ। গড়গড় করে বলে দিতে পারেন সকলের নামধাম। 
সম্ভবত তাঁর এহেন গুনোপনার দিকগুলো দেখেই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁকে স্বাগত জানিয়ে দলে নিয়ে এসেছে। তার চেয়ে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সম্ভাবতো তাঁরা প্রাধান্য দিয়েছেন। সেটি হল, মুকুল রায় এমন একটি চরিত্র যিনি দলের আগাপাশতলা চেনেন জানেন হাতের তালুর মতো। জানেন দলের গঠনতন্ত্র থেকে অন্দর মহলের বহু তথ্য। ঠিক যেমনটি জানতেন আসামের প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা ও মন্ত্রী তথা বিগত সরকারের “সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ হিমন্ত বিশ্ব শৰ্মা। আসামের রাজনৈতিক পালা বদলে এই তরুণত্যুকী নেতার মস্তিষ্ক টানা দু’বারের কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে পদ্মমণ্ডিত করে দিয়েছে আসামকে। হাতে হাতে ফল পেয়েছে গেরুয়া শিবির। তো, এক সময় এই হিমন্ত বিশ্ব শৰ্মাও ছিলেন তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ—এর বিশ্বস্ত সহকৰ্মী। পশ্চিম বঙ্গের বর্তমান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসে তো তারচেয়েও আরো বেশি বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন মুকুলবাবু। বিজেপির দিল্লির নেতারা অসম রাজনীতির চাণক্যর কথা স্মরণ রেখেই যে মুকুলবাবুকে দলে এনেছেন সন্দেহ নেই। তবে, একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আসামে কিন্তু বিজেপি বহুদিন ধরেই নিজেদের আন্দোলন বহাল রেখেছিল। আর সেখানকার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে পশ্চিম বঙ্গের পরিস্থিতিকে মিলিয়ে-গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ভুলে গেলে চলবে না, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 
কিন্তু শুধুমাত্র মুখ্যমন্ত্রী নন, তিনি কার্যত একজন জননেত্রী। ফলে, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার রসায়ন আসামে সার্থক হলেও এই পশ্চিম বঙ্গে কিন্তু “মুকুলরসায়ন” তেমনভাবে সফল হবে না। দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতার ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত তো তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁদের অধিকাংশের মতে, কোনো অর্থেই মমতার বিকল্প মুকুল হতে পারেন না। আর সকালটা দেখলেই যেমন গোটা দিন কেমন যেতে পারে তার একটা আভাস মেলে, মুকুল রায়ের দল বদল পরবৰ্তী পরিস্থিতি থেকে মোটামুটি আপাত স্পষ্ট হয়েছে, মুকুল প্রাপ্তি’তে বিজেপির আখেরে খুব সুবিধা হবে না। মুকুলবাবুর একদা ছায়াসঙ্গিনী মেদিনীপুরের তৃণমূল বিধায়ক বলেছেন, উনি দল ছেড়েছেন বলে আমার সে প্রশ্নই নেই। আমার নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর সাথেই ছিলাম এবং থাকবও। সে রক্ত বিন্দু পর্যন্ত তাঁর পাশেই থাকব। প্রায় একই কথা বলেছেন স্বয়ং মুকুলপুত্র বিধায়ক শুভ্ৰাংশু রায়ও। তিনি যেমন বলেছেন, “আমার নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমি বিজেপি চিনি না। দল পরিবর্তণ করার কোনো প্রশ্নই ওঠেনা।”
ওরিজিনাল ইনহ্যাবিটেন্টকে ঘিরে দুশ্চিন্তায় রাজ্যের সংখ্যালঘু মানুষ

ওরিজিনাল ইনহ্যাবিটেন্টকে ঘিরে দুশ্চিন্তায় রাজ্যের সংখ্যালঘু মানুষ

এন আর সি খসড়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর অভয় বাণী : ভয় পাওয়ার কিছুই নেই 

অমল গুপ্ত, গুয়াহাটি : 
প্রায় তিন কোটি ত্ৰিশ লাখ জনসংখ্যাকে নিয়ে অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এন আর সি)র কাজ শুরু হয়েছে। যা প্ৰায় শেষ পৰ্য্যায়ে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে খসড়া তালিকা প্রকাশ পাবে। ছয় কোটিরও বেশি নথিপত্র পরীক্ষা করে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। ১৯৫৫ সালে নাগরিকত্ব আইনের ৬ (এ) ধারা মেনে এবং ২০০৩ সালের সিটিজেনশ্বিপ (রেজিষ্ট্রেশন অফ সিটিজেনস এ্যাণ্ড ইস্যু অফ আইডেনটিটি কার্ড) আইন মেনে নাগরিকত্ব নবায়নের কাজ চলছে। অসম চুক্তির আধারে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের মধ্যরাত পৰ্য্যন্ত এই রাজ্যে আসা নাগরিকদের নিয়ে এন আর সির কাজ শুরু হয়েছে। এন আর সি কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে— নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক এবং বৈষম্যবিহীন এন আর সি প্রস্তুত করা হবে। এই কথাও বলেছে— ওরিজিনাল ইনহ্যাবিটেন্ট বা আদিবাসিন্দা বলে কোনও শ্রেণীবিভাজন করা হবে না। বহিঃরাজ্যের যে সব মানুষ রুজি রোজগারের স্বার্থে এই রাজ্যে এসে বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছেন, তাদের নাম এন আর সিতে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, সেই ব্যাপারে উচ্চবাচ্চ্য করেন নি এন আর সি কর্তৃপক্ষ। রাজ্যে নাগরিকপঞ্জি নবায়নের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলছে, অপরদিকে অসম-বাংলাদেশ সীমান্তের ২৬৩ কিলোমিটারের মধ্যে ৬১.৫ কিলোমিটার উন্মুক্ত হয়ে আছে। তার মধ্যে জল সীমান্ত হচ্ছে ৪৮.১১ কিলোমিটার। নিম্ন অসমের বৃহত্তম জেলা ধুবুরী-বাংলাদেশ সীমান্তে নদী পথ দিয়েই অবৈধ অনুপ্রবেশ, চােরা চালান, জাল নােট, প্রভৃতি অপরাধজনিত ঘটনার সংখ্যা বেশি বলে সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর (বি এস এফ) দাবী। ওরিজিনাল ইনহ্যাবিটেন্ট বা আদি ভূমিপুত্র কারা? সেই ব্যপারে আজও সংজ্ঞা নির্ণয় হয়নি। অসম চুক্তির অন্যতম ধারা ছিল সীমান্ত সীল করতে হবে এবং অসমীয়াদের সংজ্ঞা নির্ণয় করতে হবে। অসম চুক্তি ৰূপায়নে তিন দশক অতিক্রান্ত আজও সীমান্ত সীল হল না। নাগরিকত্বের ভিত্তি বছর ১৯৫১ হবে না। ১৯৭১ সাল হবে তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চে মামলা চলছে। অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে অসম সন্মিলিত মহাসংঘ। ১৯৫১ সালকে ভিত্তি বছর করার দাবীতে সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হয়েছে। অসম প্রদেশ কংগ্ৰেছ কমিটি ওরিজিনাল ইনহ্যাবিটেন্ট চিহ্নিতকরণের বিরোধিতা করে বলেছে খিলঞ্জিয়ার (ভূমিপুত্ৰ) সংজ্ঞা নির্ণয় প্রথমে করতে হবে। এনআরসি কর্তৃপক্ষ ওরিজিনাল ইনহ্যাবিটেন্ট বলে শ্রেণীবিভাজন করা হবে না। বলে দাবী করলেও ২০০৯ৰ সালের সংশোধিত নাগরিকত্ব (নাগরিকের পঞ্জিকরণ এবং জাতীয় পরিচয় পত্ৰ প্ৰদান বিধির ৪ (এ) অনুসূচীর ৩ (এ) ধারায় ওরিজিনাল ইনহ্যাবিটেন্ট (ওআই) বিষয়টি রয়েছে। এন আর সি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে এন আর সি তালিকায় যাদের নাম বাদ পড়বে তারা ৩০ দিনের মধ্যে নাম অন্তৰ্ভক্তের দাবী জানাতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এন আর সির কাজে যে বাধা দেবে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত করা হবে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কোনও বৈধ ভারতীয় নাগরিকের নাম এন আর সি থেকে বাদ দেওয়া হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকে ঘিরে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভাষিক ধমীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের রেজিষ্টার জেনারেল অফ ইণ্ডিয়া (আর জি আই) প্রধান শৈলেশ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতরের যুগ্ম সচিব সত্যেন্দ্ৰ গৰ্গ এবং এন আর সি প্রধান প্রতীক হাজেলা রাজ্যের আসু, আমসু, বরাক উপত্যকা বিভিন্ন সংগঠনসহ প্রায় ২৯ টি সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করলেন গুয়াহাটিতে। সেই দীর্ঘ বৈঠকে সংগঠনের মধ্যে বিভাজন লক্ষ্য করা গেল। স্পষ্ট কোনও সিদ্ধান্তের কথা জানা গেল না। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এন আর সি খসড়া প্রকাশ পাবে। ইতিমধ্যে পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা প্রায় ৪২ লক্ষ ধৰ্মীয়, ভাষিক সংখ্যালঘু মহিলাদের নাম গুয়াহাটি হাই কোর্ট বাতিল করে দিয়েছে। এই ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। ৪২ লক্ষের মধ্যে অধিকাংশের নাম এন আর সির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে না, এই আশংকায় ভুগছে রাজ্যের সংখ্যালঘু বাঙালিরা। বরাক উপত্যক সংগঠনগুলো জোরাল দাবী তুলেছে করিমগঞ্জ, কাছাড়, হাইলাকান্দি এই তিন জেলা অবিভক্ত ভারতেরই অংশ ছিল। তারা সবাই ওরিজিনাল ইনহ্যাবিটেন্ট। এন আর সির খসড়া প্রকাশকে কেন্দ্র রাজ্যের শান্তি-শৃংখলা বিঘ্নিত হতে পারে। এই আশংকার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্যের উচ্চ পয্যায়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেনা-বাহিনী এবং অর্ধ সেনা-বাহিনীকে সর্তক করে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের এই জটিল রাজনীতিক পরিস্থিতির মাঝে ডি ভোটার এবং ডিটেনশন ক্যাম্পের সমস্যার কোনও সুরাহা দেখা যাচ্ছে না। ডি ভোটারের সংখ্যা ক্রমশঃ উর্ধমুখী। ১৪৬ হাজার ডি ভোটার ছিল। প্রতিদিনই এর সংখ্যা বাড়ছে। প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক বহুবার ভোট দিয়েছে। সঙ্গে বৈধ নথিপত্ৰ আছে। তার পরও বহু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষকে ডি ভোটার সাজিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে আমসুসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো অভিযোগ করেই যাচ্ছে। ৬ টি ডিটেনশন ক্যাম্পের বন্দীরা বছরের পাৰ বছর জেলে আবদ্ধ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কোনও প্রত্যার্পণ চুক্তি নেই। এরা যাবে কোথায় ? রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল যতই অভয় বাণী দিন না কেন, কার্যত রাজ্যে ডি ভোটার, ডিটেনশ্যন ক্যাম্প, সৰ্বোপরি এন আর সি খসড়া নিয়ে সংখ্যালঘু মানুষের দুঃশ্চিন্তা ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে।
জাটিঙ্গার আত্মঘাতী পাখি : হত্যার নিন্দা মেনকা গান্ধীর

জাটিঙ্গার আত্মঘাতী পাখি : হত্যার নিন্দা মেনকা গান্ধীর


ডিমা হাসাও স্ব-শাসিত এলাকা বলে রাজ্যের বন বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে পারছে না : প্রমীলা রাণী ব্ৰহ্ম 

গুয়াহাটি : প্রতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর শীতের মৌসুমে সাইবেরিয়া, কাম্বোডিয়া, ম্যানমার প্রভৃতি ঠাণ্ডা অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি অসম তথা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন উষ্ণ অঞ্চলে এসে কয়েক মাস সময় কাটিয়ে যায়। তাদেরই এক বৃহৎ অংশ অসমের ডিমা হাসাও জেলার সদর শহর হাফলং থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ী অঞ্চল জাটিঙ্গার বিভিন্ন বনে-বাদাড়ে, পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেই। আশ-পাশের চোরা শিকারিরা ওঁত পেতে থাকে। রাতে তীব্র আলো জ্বলিয়ে নানাভাবে ফাঁদ পেতে যাযাবর পাখিগুলোকে ধরে। বৃষ্টি স্নাত, অল্প মেঘ, কুয়াশা ঢাকা ঠাণ্ডায় পাখিগুলো সাধারণত আসে।


প্রকৃতিপ্ৰেমী অমল গুপ্তর লেখা ‘আত্মঘাতী পাখি’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, জটিঙ্গা অঞ্চলের সুউচ্চ পাহাড়ে চুম্বক জাতীয় এক পাথর আছে। এছাড়াও স্ফটিক স্বচ্ছ এক পাথরও দেখা যায়। হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আসা যাযাবর তৃষ্ণাত্ব পাখিগুলো স্ফটিক স্বচ্ছ পাথরগুলিকে জলাশয় ভেবে নীচে নেমে আসে। দ্বিতীয়ত, চুম্বকের আকর্ষণে পাখিগুলোর অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা যায়। বৃষ্টি স্নাত পাখিগুলো থর-থর করে কাঁপতে থাকে। তাদেরকে যত্ন করে খাওয়ালেও খাদ্য মুখে তোলে না। এভাবেই অধিকাংশ পাখি মারা যায়। পাখিগুলোর দুরবস্থার সেই সুযোগ নেয় চােরা শিকারিরা। কোনও পাখিই স্ব-ইচ্ছায় আত্মহত্যা করে না। প্রতিকূল পরিবেশ পরিস্থিতির শিকার এই পাখিগুলোকে হত্যা করে। হাফলং-জাটিঙ্গার বিভিন্ন বাজারে, হােটেলগুলিতে বিক্রি করে। শেষ পর্যন্ত অতিথি পাখিগুলো হােটেলের প্লেটে সু-স্বাদ মাংস হিসেবে স্থান পায়। 
জাটিঙ্গায় পাখিরা স্ব-ইচ্ছাই আত্মহত্যা করে, এই ধারণার প্রেক্ষিতে জটিঙ্গা সারা বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। বিশ্বের পর্যটকরা এই মৌসুমে হাফলং-জাটিঙ্গায় ভীড় জমায়। এবারও জটিঙ্গায় পাখি আসা শুরু হয়েছে। এক বিদেশি পর্যটক স্থানীয় এক চা-বাগানের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগ-সাজোস করে তথ্য চিত্র তৈরি করছেন এবং বহু যাযাবর পাখি মেরেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে “পিপল ফর আ্যনিমেলস’-র সর্বভারতীয় সভানেত্রী মেনকা গান্ধী ডিমা হাসাও জেলার ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবিলম্বে পাখি হত্যা বন্ধের দাবী জানিয়েছেন।


রাজ্যের বন মন্ত্রী প্রমীলারাণী ব্ৰহ্ম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অসহায়তার সঙ্গে বলেছেন, জাটিঙ্গা স্ব-শাসিত ডিমা হাসাও জেলা পরিষদের অন্তৰ্ভুক্ত। তাই তাদের সেখানে হস্তক্ষেপ করাটা অসুবিধা। তবে রাজ্যের চিফ কনজারভেটার অফ ফরেষ্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বাইরের কোনও পর্যটক সেখানে গিয়ে পাখি হত্যা যেন না করে। রাজ্যে সরকারের এই নির্দেশের প্রেক্ষিতে ডিমা হাসাও জেলা প্রশাসন জাটিঙ্গার আশ-পাশ অঞ্চলে ১৪৪ ধারা জারি করেছেন অস্ত্ৰ-শস্ত্র, যে কোনও ধরণের ফাঁদ, টিচ লাইট, তীব্র আলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। 
রাজ্যের বিশিষ্ট প্রকৃতি প্রেমী তথা বরাক উপত্যকার কমিশনার ডঃ আনোয়ার উদ্দিন চৌধুরী জটিঙ্গার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি তার অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে বলেন, দেশান্তরি পাখিগুলো এখন জাটিঙ্গা ছেড়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে একটি গ্রামে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্ব গ্রামবাসীর। মনে রাখতে হবে তারা আমাদের অতিথি ।
অফুরন্ত প্ৰাকৃতিক সম্পদ বৈভবের মাঝে মানসিক দৈন্যতা

অফুরন্ত প্ৰাকৃতিক সম্পদ বৈভবের মাঝে মানসিক দৈন্যতা

🔹 অমল গুপ্ত 
ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ, পলাশির প্রান্তর, পবিত্ৰ নদি গঙ্গার কিনার থেকে এসে আজ দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় মা কামাখ্যা-ব্ৰহ্মপুত্র নদের পূণ্যভূমির আশীর্বাদ ধন্য মানুষ। জীবন জীবিকার তাড়নায় আমাকে কামাখ্যার নিলাচল পাহাড়ের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের অপাের সৌন্ধর্যের কোলে মনােরম পরিবেশের শহর গুয়াহাটি, আদি প্ৰাগজ্যোতিষপুরে থিতু হতে হয়েছে। চার পাশের সবুজ পাহাড় ঘেরা জঙ্গল, ব্ৰহ্মপুত্রের মতো দীর্ঘতম নদ, ডলফিন, বাঘ, বন্যজন্তু, প্রাকৃতিক জৈব বৈচিত্রের শহর গুয়াহাটির ‘আপাতত’তে সস্ত্রীক ডেরা বেঁধেছি। সাংবাদিকতা আমার পেশা। কিন্তু জীবিকা নয়। আমার নেশা দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ জঙ্গল, মনােরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। তার সঙ্গে অবশ্যেই আমাদের চারপাশের আত্মকেন্দ্ৰিক স্বার্থপর মানুষ। সাংবাদিকতা জীবনে স্বার্থপর মানুষের আকাশ সমান লোভ, কুট-কৌশল, রাজনৈতিক নোংরা খেলা দেখাৰ সৌভাগ্য বা দুৰ্ভাগ্য হয়েছে। যার সঙ্গে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবি, সরল গরিব মানুষের কোনও সম্পর্ক নেই। আকাশ সমান মূল্যবৃদ্ধি, আকাশ স্পর্শকরা মানুষের লোভ এবং হৃদয়হীন মানুষের ভিড়ে গরিব আম জনতার নাভিঃশ্বাস উঠছে। 

 সততা, ন্যায়— পৰায়ণতা, মূল্যবােধ, মানবতাবােধ আজ বস্তাপচা শব্দে পর্যবসিত হয়েছে। দীর্ঘ বিস্তৃর্ণ সবুজ বাঁশবন, শাল-সেগুন, ছাতিম-জারুল, বিপন্ন প্রজাতির এক শৃংগ বিশিষ্ট গণ্ডার আমাকে টানে। কাজিরঙার জীবন্ত গণ্ডারের খড়গ কেটে চােরা শিকারিরা পালাচ্ছে। রক্তাক্ত গণ্ডারের ছট্‌ফটানি আমাকে কাঁদায়। জাটিংগা পাহাড়ের আত্মঘাতী পাখিরা স্ব-ইচ্ছায় আগুনের লেলিহান চিতায় জাঁপ দিচ্ছে, তা আমাকে ভাবায়। হিটলারের কনশেনট্রেশন ক্যাম্পের মতো এ রাজ্যের ডিটেনশন ক্যাম্পে বিনা বিচারে অন্ধকার কুঠুরিতে কমলা, জাহান নেসারা মনুষ্যতের জীবন-যাপন করছেন। তা আমার মনকে বেদনায় ভারাক্রান্ত করে। আমি ভাবি এই কী আমাদের স্বাধীন ভারতবর্ষ ? নিন্ন অসমের কয়েক হাজার চরাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ সংখ্যালঘু মানুষ এক অভাবণীয় যন্ত্রনাময় জীবন-যাপন করছে। সরকারের নূ্যনতম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। 


দীর্ঘ ৫০–৬০ বছর এরাজ্যে বসবাস করার পরেও বাংলাদেশী তকমা তাদের ভবিতব্য। বাৎসরিক বিধ্বংসী বন্যায়। তাদের ঘর-বাড়ী সব ধুয়ে মুছে যায়। বানভাসি গরিব মানুষগুলো শুধুই ঠিকানা বদল করে। শেষ পর্যন্ত তাদের ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায় গুয়াহাটি মহানগরী। এই তথাকথিত “বাংলাদেশী” মানুষগুলো গুয়াহাটি মহানগরকে গড়ছে, ভাঙছে। তাই সুৰম্য প্রাসাদে ভরে উঠেছে। গুয়াহাটি। সেই মানুষগুলির কিন্তু কোনও মূল্য নেই। গুয়াহাটিতে আমাদের কাজের মেয়ে সংখ্যালঘু গরিব ঘরের মেয়েরা। প্রয়োজন ফুরালেই দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিই। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর অসম। বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে স্থান করে নেওয়ার মতো নানা বৈশিষ্ট্য এরাজ্যে আছে। এশিয়ার বৃহত্তম নদিদ্বীপ মাজুলি, শ্ৰীমন্ত শংকর দেবের স্মৃতি বিজড়িত মাজুলি সত্রীয় সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিত। অসমের বিহু নৃত্যও বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছে। অসমের এক শৃংগ বিশিষ্ট গণ্ডার রাজ্যকে বিশ্বের কাছে পবিচয় করিয়ে দিয়েছে। মিশরের পিরামিড দেখতে মানুষ ছুটে যায়, কিন্তু অসমে শিবসাগর জেলার চরাইদেউয়ের মাটির স্তুপ দেখার জন্য বিশ্বের পর্যটকরা যাননা, জানেওনা। আহােম রাজত্বের রাজা মহারাজাদের সমাহিত করা হত সেই সব স্তুপের মাঝে।

 সেই মাটি খুড়ে আজও রাজা-মহারাজাদের সোণালি ইতিহাস, তাদের ব্যবহৃত স্বৰ্ণালংকার, আসবাবপত্র, পোষাক-পরিচ্ছন্দ পাওয়া যাচ্ছে। যা বর্তমানে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়ার তত্বাবধানে সংরক্ষিত হয়ে আছে। দাৰ্জিলিঙের টয়ট্রেন চড়তে মানুষ ছুটে যান। কিন্তু লামডিংশিলচরের পাহাড় লাইনের প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্যের যে হাতছানি তাকে কেউ অগ্রাহ্য করতে পারবেনা। কেবল মাত্র সরকারের অবহেলা-অনাদরের জন্য পাহাড় লাইনে কোনও পরিকাঠামো নেই। উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে জটিংগা-হাফলং-মাহুর মিটারগেজ লাইনের প্রায় একশো কিলোমিটার পরিত্যাগ করে ব্রডগেজ লাইন নির্মাণ করায় পাহাড়ের সৌন্দৰ্য্য ধ্বংস হয়ে গেছে। শত বছরের প্রাচীন ৩৭ ট্যানেলের মধ্যে ১০ টি ট্যানেল বাদ দিয়ে ব্রডগেজ নির্মাণ করা হয়েছে। পরিত্যক্ত প্রায় একশো কিলোমিটার মিটারগেজ লাইনে দাৰ্জিলিঙের মতােটয়ট্রেন চালিয়ে সরকার। ৰাজস্ব বৃদ্ধি করতে পারতাে। অসমের ভূ-গর্ভে কয়লা, গ্যাস, তেল প্রভূতির অফুরন্ত ভাণ্ডার। উজান অসমে ভূ-গৰ্ভস্থ গ্যাস ২৪ ঘণ্টায় জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। সেই বহু মূল্যবান গ্যাস ব্যবহারের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মাৰ্ঘেরিটার ওপেন কষ্ট কয়লার অফুরন্ত ভাণ্ডার। সেই কয়লায় সালফার থাকার জন্য বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। 


সামান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেইসালফার বিযুক্ত করা যেতে পারতো। বঙ্গাইগাওয়ের বৃহৎ আয়তনের তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়লা বাইরের রাজ্য থেকে আমদানি করা হচ্ছে। চীন-তিব্বত, হিমালয়ের উৎস থেকে ২৯০৬ কিলোমিটার ব্ৰহ্মপুত্র নদ প্রবাহিত হয়েছে। যা অসমের জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংগ। চীনের ধ্বংসাত্মক ‘হুয়াংহাে’ নদী নিয়ন্ত্রণ করে চীন সরকার অর্থনীতিকে স্বচ্ছল করে তুলেছে। আর অসমে প্রতি বছর ব্ৰহ্মপুত্রের ভয়াবহ বন্যায় রাজ্যের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই প্রথম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোণোয়াল নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ব্ৰহ্মপুত্ৰ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তা যদি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়, তবে রাজ্যের আর্থিক অবস্থা আমূল পরিবর্তন ঘটবে। রাজ্যে পিক আওয়ারে ১৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু নিজস্ব উৎপাদন মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট। ব্ৰহ্মপুত্রের অঢেল জলরাশি সদ্ব্যবহার করা হলে অসমের বিদ্যুৎ চিত্র আমূল পাল্টিয়ে যেত। 

রাজ্যের ৮০০ বেশি চা বাগানে দেশের ৬০ শতাংশ চা উৎপাদন করে, নানা সমস্যায় জর্জরিত চা বাগান। যথাযথভাবে সদ্ব্যবহার করা হলে রাজ্যের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতো। এ ছাড়াও অপাের বনজ সম্পদ, ঔষধি গাছ-গাছড়া, বিভিন্ন প্রজাতিৰ অৰ্কিড, প্রজাপতি, কাজিরঙার এক শৃংগ বিশিষ্ট গণ্ডার, সাদা ডানার বুনো হাঁস, ডিব্ৰু-সাইখোয়া অভয়ারণ্যের বুনাে ঘোঁড়া, মানসের ব্যাঘ্র প্রকল্প প্রভৃতি অফুরন্ত জৈব বৈচিত্র, শুয়ালকুছির মুগা সিন্ধ, সৰ্থেবারির কাসা শিল্প প্রভৃতি অসমকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অসম সরকার ১০ কোটি বৃক্ষ রোপনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। কিন্তু বৃক্ষ রোপন হলেও তা সংরক্ষণের বড় অভাব। আমারই লেখা “বনে বনান্তরে” শীৰ্ষক গ্রন্থে দেশের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী পান্নালাল দাসগুপ্ত গত ২০১৫ সালের ২৪শে মে’তে তার “ভূমিকায় লিখে গেছেন– “আমাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল তার বন সম্পদ। 

 মানুষের লোভে সেই বন সম্পদকে বোপেরোয়াভাবে উজাড় করে ফেলছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর জন্য কি মূল্য দিতে হবে, সে কথা এখন কেউ চিন্তাও করেনা। বনসম্পদ ধ্বংস করার অন্যতম কুফল হলো বৃষ্টিপাতের পরিমান কমে যাওয়া এবং ভূমিক্ষয়। গত কয়েক বছর ধৰে আমি আসামের সরকারীবেসরকারী নেতাদের বনজ সম্পদ ধ্বংসের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে বলে আসছি। আকাশ থেকে বীজ ছিটিয়ে (এৰিয়্যাল সিডলিংক) বন সৃজন করার প্রস্তাব আমি দিয়ে ছিলাম।” আমাৰ পরিবেশ প্রকৃতি বিষয়ক দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘অসমের রবীন আঙ্কলার নায়ক এবং প্রকৃতি প্রেমী রবীন ব্যানাজীর এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। পিপল ফর আ্যনিমেলসের কর্ণধার সংগীত গোস্বামী তার ভিডিঅ’গ্ৰাফী করেছিলেন। সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রবীন ব্যানাজী বলে গেছেন— “কাজিরাঙাকে আর বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখা যাবেনা। মানুষের লাগাম ছাড়া লোভের বলি হবে কাজিরাঙাকে। 


এই প্রকৃতি প্রেমী ব্যানাজী ৬০ দশকে কাজিরঙার এক শৃংগ বিশিষ্ট গণ্ডারের ছবি বার্লিন টেলিভিশনে দেখিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। তার পরই কাজিরঙকে রাষ্ট্ৰীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি জানানো হয়। ২৬৩ কিলোমিটার অসাম-বাংলাদেশ সীমান্তের ৬১ কিলোমিটারে জল ও স্থল সীমান্ত আজও সীল করা হলো না। আজও বাংলাদেশী ইসু ছাড়া রাজ্যের রাজনীতিকদের রাজনীতি হয়না। অসমের থেকে চারগুণ বেশি ৮৫৬ কিলোমিটারের সীমান্তরাজ্য ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে এই প্রতিবেদক জিজ্ঞাস করেছিল—আপনাদের কোনও বাংলাদেশী সমস্যা নেই? জবাবে মানিক সরকার বলেছিলেন— “বাংলাদেশী সমস্যা একমাত্র অসমেই আছে। দেশের কোনও রাজ্যে নেই। প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশীরা ত্রিপুরায় আসে, দিনভোর পরিশ্রম করে, আবার ফিরে যায়। 

আমাদের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। সে ক্ষেত্রে আমরা লাভবান হই।” অসমে বরাক-ব্ৰহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্যে নানা টানা পোড়েন চলছে। একাংশ জাতীয়তাবাদী শক্তি নানাভাবে উস্কানিমূলক কান্ড-কর্ম করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিষিয়ে তুলছে। আজও লাওখোয়া, নেলী প্রভৃতি জায়গায়ৰ মতো বিশ্বকােপানাে হত্যাকাণ্ড অনেকের স্মৃতিতে অস্নান হয়ে আছে। তার পরেও জাতীয়তাবাদী চক্র, অশুভ দেশবিরোধী শক্তিকে সঙ্গী করে আস্ত্রের ঝন-ঝনানি শুনাচ্ছে। তাই আজান ফকির, শংকর দেবের সম্প্রীতির রাজ্যে আজও রাজ্যের সংখ্যালঘু মানুষ অজানা-আশংকায় আতংকিত হয়ে থাকে। এত কিছু লিখে আপনাদের বিরক্তি বাড়ানোর একটিই কারণ। অসমে এত সম্পদ থাকার পরও তা সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। আমরা আত্মকেন্দ্ৰিক স্বার্থপর মানুষরা আজও সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি, ভাতৃত্ববােধে উদ্ধৃদ্ধ হয়ে অসমকে উচ্চাসনে নিয়ে যেতে পারছিনা। ফোন : +91 9864044239